ড. মুহাম্মদ ইউনূস কে?
.jpg)
ড. মুহাম্মদ ইউনূস কে! কি তার পরিচয়! বাংলাদেশের ভাগ্য আকাশে এ-কোন মানবের আবির্ভাব! সব প্রশ্নের উত্তর মিলছে আমাদের আজকের এই লেখাটিতে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এর ব্যাক্তিগত জীবনসহ বিস্তারিত তথ্য জানতে আমাদের সাথেই থাকুন৷
ড. মুহাম্মদ ইউনূস কে?
ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন বাঙালি। এটাই তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। পাশাপাশি তিনি একজন উদ্যোক্তা, ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠাতা। মাইক্রোক্রেডিট ধারণার প্রবর্তক হিসেবে তিনি ইতিমধ্যেই সারা বিশ্বে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ১৯৪০ সালের ২৮ জুন জন্মগ্রহণকারী ইউনূস ২০০৬ সালে তার নিজ পরিশ্রম এবং প্রচেষ্টার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে আরেকটু ভেঙে বললে বলতে হয় তার কাজের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো গ্রামীণ ব্যাংক! আর বাংলাদেশে বসবাস করেন অথচ কখনো গ্রামীণ ব্যাংকের নাম শোনেননি এমন কাউকে তো খুঁজে পাওয়াটাই দুষ্কর! তবুও যারা এখনো অনেক তথ্যই জানেন না বা জানার সুযোগ হয়নি তারা আর্টিকেলটির শেষ পর্যন্ত চোখ রাখুন। আশা করি জ্ঞান পিপাসার্থ হৃদয় খানিকটা হলেও শান্ত হবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কাজ হলো দরিদ্র ব্যক্তিদের বিশেষভাবে মহিলাদের কোনো ধরণের জামিনদার ছাড়াই ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করা। আর তার এই উদ্ভাবনী পদ্ধতি উদ্যোক্তাদের অর্থ দিয়ে সহায়তা করে আসছে বহু বছর ধরে। গ্রামীণ ব্যাংকের পাশাপাশি ইউনূস আরও বিভিন্ন সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে কাজ করেছেন এবং করছেন। আর এসবের মাঝে সামাজিক বিভিন্ন ব্যবসার মডেল এবং নানাধরণের উন্নয়ন প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত।
মুহাম্মদ ইউনূসের জীবনী
ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন খাঁটি চাটগাঁইয়া। তিনি ১৯৪০ সালের ২৮ জুন চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন৷ হয়ে উঠেন উদ্যোক্তা এবং অর্থনীতিবিদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি অর্জন করেন।
১৯৭০-এর দশকে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস দারিদ্র্য নিরসনের ওপর কাজ করতে শুরু করেন। সেই সাথে বাংলাদেশে গ্রামীণ এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক সংকটের প্রতি গভীরভাবে ফোকাস দিতে শুরু করেন। চেষ্টা করেন তাদের নিয়ে নতুন নতুন আইডিয়া জেনারেট করবার। কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন নতুন সব অভিজ্ঞতা।
আর তার এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, তিনি মাইক্রোক্রেডিট নামে একটি আর্থিক মডেল বাংলাদেশে রান করার চেষ্টা করেন৷ যার মূল কাজ হলো জামিনবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করা।
অবশেষে এর ফলস্বরূপ, ১৯৮৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস এর তত্বাবধানে। এই ব্যাংক দরিদ্র জনগণের, বিশেষ করে মহিলাদের ছোট ছোট ব্যবসা দাঁড় করাতে আর্থিক দিয়ে নানাভাবে সাহায্য করে থাকে৷
শুধু বাংলাদেশেই নয়! ইউনূসের উদ্ভাবনী মাইক্রোফিনান্স পদ্ধতি কিন্তু পুরো বিশ্বকেই তাক লাগিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের বহুদেশে চালু হয়েছে একই মডেলের প্রোগ্রাম। যার দরুণ তিনি অর্জন করতে সক্ষম হোন ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার। তাকে এবং গ্রামীণ ব্যাংককে যৌথভাবে এই পুরষ্কারে পুরষ্কৃত করা হয়। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সৃষ্টির জন্যেই মূলত তিনি এই সম্মাননায় ভূষিত হোন।
মাইক্রোক্রেডিটের পাশাপাশি, ইউনূস বিভিন্ন সামাজিক ব্যবসা এবং উদ্যোগে যুক্ত রয়েছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশগত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানেও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অবদান দেখার মতো। বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাসের একজন বিশিষ্ট পৃষ্ঠপোষক হিসাবে তাকে বিবেচনা করলে এতোটুকুও বেশি বলা হবে না।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ছেলেবেলা
চট্টগ্রামে হাটহাজারী পরিবারে জন্ম নেওয়া ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছিলেন ৯ ভাইবোনের মাঝে তৃতীয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি গ্রামে বড় হয়েছেন। ম্যাট্রিক পাশ করেছেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে। সে সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের ৩৯,০০০ শিক্ষার্থীর মাঝে হোন ১৬তম। তবে এর আগে তিনি পারিবারিকভাবে কিছুটা সমস্যায় পড়েন। কারণ এসময় তার মা মানসিকভাবে অসুস্থ হতে শুরু করে।
১৯৫৭ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। সে-সময় তিনি ঢাবি থেকে অর্থনীতি বিভাগে স্নাতক অর্জন করেন৷ স্নাতকের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস যোগ দেন একটি গবেষণা কার্যক্রমে একজন সহকারী হিসাবে। পরবর্তীতে তিনি যোগ দেখ চট্টগ্রাম কলেজের একজন প্রভাষক হিসাবে। একই সময়ে বিভিন্ন প্যাকেজিং কোম্পানি খুলে সকলের সামনে আসতে শুরু করেন তিনি।
১৯৬৫ সালে তার ডাক আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাস ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে। ১৯৭১ সালে পিএইচডি অর্জন করেন অর্থনীতির উপর। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত, ইউনুস মার্ফ্রিসবোরোতে মিডল টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেন একজন সহকারী অধ্যাপক হিসাবে।
তার আগে অর্থ্যাৎ ১৯৭১ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নাগরিক কমিটি প্রতিষ্ঠা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশাল জনমত সৃষ্টি করেন। এরই প্রেক্ষিতে পরিচালনা করেন বাংলাদেশ ইনফরমেশন সেন্টার। 'বাংলাদেশ নিউজলেটারও' প্রকাশ করা শুরু করেন তার নিজ বাড়ি থেকে। যুদ্ধ শেষ হলে তিনি পুরো দমে নেমে পড়েন দেশ সংস্কারের কাজে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস পুরো দমে দারিদ্র্যতার বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম শুরু করেন ১৯৭৪ সাল থেকে। এ-সময় বাংলাদেশে দূর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সবকিছু মিলিয়ে তিনি বুঝতে পারেন এক একজন দরিদ্রের কাছে স্বল্প পরিমাণে ঋণ ঠিক কতটা দরকার এমন করুণ সময়ে। সবকিছু নিয়ে ভেবেচিন্তে তিনি গ্রামীণ অর্থনৈতিক প্রকল্প শুরু করেন। যদিও এই প্রকল্পটি ছিলো পরীক্ষামূলক এবং কেবলমাত্র গবেষণার জন্যেই।
একই বছর তিনি তেভাগা খামার তৈরি করে সরকারের আন্ডারে তা প্যাকেজ আকারে সকলের মাঝে বিতরণ করতে শুরু করেন। এরপরও তিনি থেমে থাকেননি। সরকারকে তিনি 'গ্রাম সরকার' কর্মসূচি প্রস্তাব করেন৷ যা পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রবর্তন করেন। বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশের বিভিন্ন উদ্ভাবকদের সহায়তায় তিনি 'ইনফো লেডি সোশ্যাল এন্টারপ্রেনারশিপ' প্রোগ্রাম চালু করেন। যার মূল কাজ ছিলো ইউনুসের ক্ষুদ্রঋণ ধারণাকে আরো অর্থবহ করে তোলা।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পারিবারিক তথ্য
আপনি কি জানেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পরিবারে কে কে আছেন? তার ছেলেমেয়েই বা কয়জন? আসুন এবারে জেনে নিই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পারিবারির তথ্য সম্পর্কে:
পিতামাতা: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পিতার নাম ইউনুস মোহাম্মদ চৌধুরী এবং মাতার নাম বেগম মোহাম্মদ চৌধুরী। তারা দু'জনই ছিলে ৯ সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ হিসাবে গড়ে তোলায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পিতা মূলত একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন।
ভাইবোন: ড. ইউনুস পরিবারের তৃতীয় সন্তান এবং তার আরো ৮ ভাইবোন আছে। তাদের মাঝে ভাই ড. আফসার আহমেদ এবং বোন আয়েশা চৌধুরী বেশ জনপ্রিয়। ব্যাক্তিগত জীবনে বোন আয়েশা চৌধুরী বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষা উদ্যোগের সাথে জড়িত আছেন। অন্যদিকে ভাই ড. আফসার আহমেদ পেশায় একজন বিশিষ্ট চিকিৎসক।
স্ত্রী: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বর্তমান স্ত্রীর নাম ড. আয়েশা চৌধুরী। তিনি একজন চিকিৎসক এবং ইউনুসের বিভিন্ন উদ্যোগের সহযোগী যোদ্ধা।
সন্তান: মুহাম্মদ ইউনূসের একমাত্র সন্তান ড. মনিকা ইউনুস! বর্তমানে তিনি বেশ জনপ্রিয় এবং পরিচিত সোপ্রানো সঙ্গীতশিল্পী হিসাবে কাজ করছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও দানশীল কার্যক্রমে জড়িত আছেন। বলে রাখা ভালো এই ড. মনিকা ইউনুস কিন্তু ইউনূসের তৎকালীন স্ত্রী রাশিয়ান বংশোদ্ভুত ভেরা ফরস্তেনকো-এর কন্যা।
ড. ইউনূসের ব্যবসা
এবার আসি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যবসার ব্যাপারে। যে ব্যবসার কারণে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় সে ব্যবসার নাম হলো গ্রামীণফোন। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এটি। মেয়েদের জামিন ছাড়াই লোন দেওয়া ছিলো এই ব্যাংকের মূল কাজ। দারিদ্র ব্যাক্তিরা বিশেষ করে মেয়েরা যাতে ছোট ছোট ব্যবসা শুরু করে জীবন পাল্টাতে পারে তারই ব্যবস্থা করে দেয় গ্রামীণব্যাংক। শুধু গ্রামীণব্যাংকই নয়! বরং ইউনূস সারা জীবন বিভাব লাভজনক ও অলাভজনক ব্যবসাও প্রতিষ্ঠা করে গেছেন৷ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানতে আমাদের সাথেই থাকুন।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের যত প্রতিষ্ঠান
কেবল ১/২ টি নয়! বরং অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আসুন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিভাব প্রতিষ্ঠান দেখে নিই এক পলকে!
১. গ্রামীণ ব্যাংক
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রধান ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নাম গ্রামীণ ব্যাংক। বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করে এই ব্যাংকটি। ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীদের নতুন ব্যবসা শুরু পথ তৈরি করে দেয় গ্রামীণ ব্যাংক। ব্যাংকটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো:
১. এখান থেকে লোন নিতে হলে গ্রহীতার জামিনদার থাকতে হবে না। সামাজিক জামিন কিংবা গ্রুপিং জামিন থাকলেই লোনের জন্যে আবেদন করা যাবে।
২. এই লোনের আন্ডারে ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা একটি গ্রুপ তৈরি করে। আর এই গ্রুপের মূল কাজ হলো পারস্পরিক সহায়তা এবং দায়িত্বশীলতাকে পুঁজি করে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
৩. ঋণ ছোট হলে নিয়মিত কিস্তিতে তা পরিশোধ করতে হয়। সাধারণত প্রতিটি ঋণই বিশেষ করে ছোট ছোট ঋণ পরিশোধ করতে হয় সাপ্তাহিক ভিত্তিতি।
২. গ্রামীণ ফাউন্ডেশন
১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ফাউন্ডেশনও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তৈরি করা একটি প্রতিষ্ঠান। মার্কিন-ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি এখনো কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী মাইক্রোফিনান্স এবং উন্নয়ন প্রকল্পকে আরো অর্থবহ করে তুলছে এই গ্রামীণ ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনটিন গুরুত্বপূর্ণ কিছু সেক্টর হলো অর্থনৈতিক সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা।
৩. সামাজিক ব্যবসা
ড. ইউনূস বিভিন্ন সামাজিক ব্যবসাও রয়েছে৷ এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আন্ডারে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধান করা হয়ে থাকে। তবে মজার বিষয় হলো এসব কোনো লাভজনক প্রতিষ্ঠান নয়! সবগুলোই অলাভজনক!
৪. গ্রামীণফোন
আপনি হয়তো ইতিমধ্যেই জানেন গ্রামীণফোন ইউনূসেরই প্রতিষ্ঠিত একটি টেলিকম কোম্পানি৷ দেশের প্রধান মোবাইল টেলিযোগাযোগ কোম্পানি এবং গ্রামীণ শক্তির উৎস এই সিম টেলিযোগাযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়নশীল কাজেও যুক্ত থেকে মানুষের সেবা করে আসছে।
গ্রামীণ ব্যাংকের সফলতা
গ্রামীণ ব্যাংকের সফলতার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংক মাইক্রোফাইন্যান্সের কারণে বেশ বিখ্যাত। ছোট ছোট ঋণ প্রদান করার মডেলের উপর নির্ভর করে এই ব্যাংকের মডেল তৈরি করা হয়েছে। যার মূল উদ্দেশ্য দরিদ্র মানুষদের, বিশেষ করে নারীদের, ছোট ছোট ব্যবসা শুরু করিয়ে দিয়ে জীবন পরিবর্তন করা! গ্রামীণ ব্যাংকের সফলতার মূল দিকগুলো হলো:
১. মাইক্রোক্রেডিট মডেল! যে মডেলের চমৎকার দিক হলো আপনি বেশ ছোট আকারের লোন নিতে পারবেন কোনো ধরনের জামিন ছাড়াই! প্রচলিত ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে এই সিস্টেম কিছুটা ভিন্ন!
২. গ্রামীণ ব্যাংকের সফলতার মূলমন্ত্র হলো গ্রুপিং। যারা লোন নেয় তারা প্রত্যেকেই একটি গ্রুপ তৈরি করে। আর সেই গ্রুপটি প্রত্যেক সদস্যের লোন পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করে। কেউ যদি সময়মতো লোন দিতে নাও পারে সেক্ষেত্রে এই গ্রুপের সাহায্য নেওয়া হয়।
৩. ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই গ্রামীণ ব্যাংকের ক্লায়েন্টদের একটি বড় অংশ হলো নারী৷ যারা প্রায়ই দারিদ্র্যতার কারণে কোনো ব্যবসা শুরু করতে পারে না! এই ব্যাংক শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়, বরং নারী অধিকার এবং স্বাবলম্বিতা নিশ্চিতেও কাজ করে থাকে।
৪. এর পাশাপাশি গ্রামীণ ব্যাংক বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্মও করে থাকে। বাংলাদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সাধারণ জীবনযাত্রার উন্নতি সাধনে বড় অবদান রাখছে এই ব্যাংকটি।
৫. গ্লোভালি গ্রামীণ ব্যাংকের সফলতা দেখার মতো। ঠিক এই ব্যাংকের মডেলের মতো করেই পৃথিবীর অন্যান্য দেশ মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান তৈরির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। যা করছে দারিদ্র্যতা হ্রাসের মডেল হিসাবে।
আর এতোসব সফলতাই একসময় ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। মুহাম্মদ ইউনুস এবং গ্রামীণ ব্যাংক ২০০৬ সালে যৌথভাবে এই পুরষ্কার লাভ করেন৷
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সফলতা
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সফলতা কিন্তু আকাশসম। বিশেষ করে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে তার মাইক্রোফাইন্যান্স ধারণার প্রবর্তনের বিষয়টি দেখার মতো। গরীবদের ছোট ছোট ঋণ প্রদান করে তাদের জীবনের পরিবর্তন আনাই ছিলো ইউনূসের এই ব্যাংকিং সিস্টেম প্রতিষ্ঠার মূল কারণ৷ যেহেতু সারাবিশ্বে এখনো বিভিন্ন দেশ দারিদ্রতায় ভুগছে, সেহেতু ইউনূসের এই সিস্টেম সারাবিশ্বে তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সর্বোপরি ইউনুস এবং গ্রামীণ ব্যাংককে নোবেল শান্তি পুরস্কারে সম্মানিত করাটাই ছিলো তার সফলতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মুহাম্মদ ইউনুসের প্রধান প্রধান কিছু সফলতা হলো:
- ১৯৮৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা
- ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ
- গ্রামীণ ব্যাংকের মাইক্রোকেডিট মডেলের প্রবর্তন
- সামাজিক ব্যবসার ধারণা
- বিভিন্ন জনপ্রিয় বইয়ের প্রকাশ
- ইউনূসের সামাজিক উদ্যোগ
এবার আসি ইউনূসের সামাজিক উদ্যোগের ব্যাপারে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বেশকিছু সামাজিক উদ্যোগের মাঝে রয়েছে:
১. জামানত ছাড়াই গরীবদের মাইক্রোলোন প্রদান করা প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক।
২. সামাজিক সমস্যা সমাধানের উপর ভিত্তি করে আর্থিকভাবে টেকসই এবং যুগোপযুগি ব্যবসার ধারণা প্রবর্তন।
৩. নিম্নআয়ের সম্প্রদায়ের জন্য স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমিয়ে আনা।
৪. অবহেলিত এলাকায় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি।
৫. গ্রামীণ মৎস্য ও কৃষি ব্যবসায়ীদের বিশেষভাবে বাড়তি সুযোগ প্রদান।
ইউনূসের ব্যবসায়িক মডেল
ড. মুহাম্মদ ইউনুসের বিজনেস মডেল বর্তমানে এতোটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে যে, রীতিমতো এ নিয়ে অসংখ্য গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যেই তার এই মডেলের উপর কাজ করার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছে। অথচ আমরা বাঙালি হয়েই এখনো অনেকে তার এই বিজনেস মডেল সম্পর্কে জানি না! যাইহোক! ড. মুহাম্মদ ইউনুসের বিজনেস মডেলগুলি ঠিক এমন:
মাইক্রোলোন
এই ধরণের লোন সাধারণত ছোট পরিমাণের হয়ে থাকে। যারা ছোট ছোট বিজনেস করতে চায় কিন্তু ইনভেস্ট করার মতো টাকা নেই তারা এই ধরণের লোন নিতে পারবে। এই ধরণের লোনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এসব লোন কোনো রকম পারমাণেন্ট সিকিউরিটি ছাড়া প্রদান করা হয়। লোন প্রদানের সময় সবচেয়ে বেশি ফোকাস করা হয় নারীদের উপর। যেহেতু তাদের বাড়তি কোনো ইনকাম সোর্স অনেক সময়ই থাকে সেহেতু তাদের জন্যে বাড়তি ইনকাম সোর্সে ব্যবস্থা করতেই এই লোনের আয়োজন।
এই ধরণের লোনের আন্ডারে আপনি ৫০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত লোন নিতে পারবেন। পরিশোধের সময়সীমা হিসাবে পাবেন ৬ থেকে ১২ মাস। তাছাড়া ইউনূসের তৈরি করা এই লোন সিস্টেমে সুদের হার তুলনামূলকভাবে কম রাখা হয়। আর এই অর্থ সাধারণত পরবর্তীতে মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের খরচ মেটাতে সাহায্য করে।
গ্রুপ লেন্ডিং
সকলকে ছোট ছোট গ্রুপে সংগঠিত করে লোন দেওয়ার সিস্টেমকে বলা হয় গ্রুপ লেন্ডিং মডেল। এটিও ড. মুহাম্মদ ইউনুসের জনপ্রিয় একটি বিজনেস মডেল। এই মডেলের নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত ৫-১০ সদস্যের একটি টিমকে লোন দেওয়া হয় এবং প্রতিটি সদস্য নিজ লোনের জন্য দায়ী থাকে। পারস্পরিক সহায়তা এবং দায়িত্ববোধ থাকলে এই লোন সিস্টেম খুব অল্প সময়েই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। যাদের মাঝে এই ধরণের লোন প্রদান করা হয় তাদের নিজেদের মাঝে যোগাযোগের স্বার্থে নিয়মিত গ্রুপ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভায় বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করে নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয় লোনগ্রহীতাদের!
সামাজিক ব্যবসা
এই ধরণের বিজনেস মডেলের মূল বিষয় হলো কোনো লাভ নেওয়া ছাড়াই দারিদ্রতার বিরুদ্ধে কাজ করা। যে ব্যবসা থেকে ইতিমধ্যেই অনেক টাকা আয় করা যাচ্ছে সে ব্যবসাতেও বারবার ইনভেস্ট করাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে এই বিজনেস মডেলের। আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক লক্ষ্যসহ সবকিছু ঠিকঠাক থাকার কারণে বিভিন্ন দেশে এই ধরণের বিজনেস মডেলের বেশ গুরুত্ব রয়েছে। কেবল আমাদের দেশেই এমন মাথানষ্ট বিজনেস মডেলকে গ্রাহ্য করা হয় না।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আয়ের উৎস
গ্রামীণ ব্যাংকসহ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশে যেসব ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন তার কোনোটাতেই তিনি নিজের জন্যে কোনো শেয়ার রাখেননি। এতোকিছুর পরও তাদের সম্পদেরও কোনো কমতি নেই। এখন প্রশ্ন হলো ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আয়ের উৎস কি? চলুন জানি।
পরামর্শদাতা
বিশ্বের বিভিন্ন সরকার অর্থ দিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের পরামর্শ নেন। বিশেষ করে কোনো দেশের দারিদ্র্যতা কিভাবে দূর করা যায়, কি কি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত সবকিছু নিয়েই তিনি পরামর্শ দেন। সরকারের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সংস্থাকেও এসব পরামর্শ দিয়ে থাকেন। মাইক্রোফাইন্যান্স, সামাজিক ব্যবসা এবং দারিদ্র্য দূরীকরণের বিষয়ক এসব পরামর্শের ধরণ অনুযায়ী তার মূল্য নির্ধারিত হয়ে থাকে।
বক্তৃতা
আপনি জানলে অবাক হবেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তৃতা শুনবার জন্যেও অন্যান্য দেশে টাকা গুনতে হয়। বিভিন্ন সম্মেলন কিংবা অনুষ্ঠানে তিনি নানান বিষয়ের উপর লেকচার দিয়ে থাকেন। সেখানে তিনি সামাজিকভাবে উদ্যোক্তা হওয়ার উপায় ও মাইক্রোফাইন্যান্স সম্পর্কিত তার অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞান শেয়ার করেন।
বই প্রকাশনা
ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার নিজের মেধা, গবেষণা এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন বইও প্রকাশ করেন। রয়্যালিটি থাকার কারণে তিনি এসব বই সেল করার একটি বড় অংশ পান। তার "ব্যাঙ্কার টু দ্য পুওর" এবং "বিল্ডিং সোশ্যাল বিজনেস" এর মতো বেশকিছু জনপ্রিয় বই আছে। মাইক্রোফাইন্যান্স ও সামাজিক ব্যবসার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে আপনিও এসব বই পড়তে পারেন।
পুরস্কার ও সম্মাননা
২০০৬ সালে পাওয়া নোবেল শান্তি পুরস্কারসহ ইউনূসের বিভিন্ন পুরষ্কারের অর্থও তার একপ্রকার ইনকাম সোর্স।
ইতি কথা
সবকিছু বিবেচনা করে বলাই যায় বাঙালি ভাগ্য করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে পেয়েছে। তার অভিজ্ঞতা, গবেষণা এবং মেধা বাঙালির কাছে আশীর্বাদস্বরূপ। যদিও বাঙালি তা বুঝতে অনেকটা দেরি করে ফেলেছে! তবে সময় এখনো খানিকটা বাকি আছে। সময় বাকি আছে কিছুটা হলেও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ঋণ শোধ করবার!