নারিকেল তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা
নারিকেল তেল! আমাদের বাঙালির জীবনে বেশ কমন একটি প্রোডাক্ট। এমন কোনো বাঙালি ঘর খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে নারিকেল তেলের ব্যবহার চলে না। কিন্তু আমরা কি আদৌ নারিকেল তেলের বিভিন্ন ব্যবহার সম্পর্কে জানি? নারিকেল তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে কি আমাদের পরিপূর্ণ আইডিয়া আছে? সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে আজকের এই আর্টিকেলে। সুতরাং সাথেই থাকুন।
প্যারাসুট নারিকেল তেলের উপকারিতা
শুরুতে চলুন প্যারাসুট নারিকেল তেলের উপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। রান্নাবান্না, রূপচর্চা কিংবা স্বাস্থ্য সচেতনতা…সবদিক দিয়েই যেনো নারিকেল তেলের জয়জয়কার। তবে ত্বকের যত্নে ও চুলের যত্নে নারিকেল তেলের যে ভুমিকা তা কোনোভাবেই অস্বীকার করার মতো নয়। যেসব উপকারিতার কারণে আপনিও নিয়মিত ব্যবহার করতে পারেন এই নারিকেল তেল:
হৃদরোগ
নারিকেল তেলের উপকারিতা ও অপকারিতার মাঝে উপকারিতার পরিমাণ বেশি। আর এই উপকারিতার অংশ হিসেবে হৃদরোগের কথা একেবারে না বললেই নয়! নারিকের তেলে রয়েছে মিডিয়াম-চেইন ট্রাইগ্লিসারাইডস (MCTs)। যা আপনার হার্টের ভালো অর্থ্যাৎ HDL কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে এবং খারাপ অর্থ্যাৎ LDL কোলেস্টেরল কমাতে পারে। আর ওভারঅল এই উপকারিতা আপনাকে হৃদরোগের বিভিন্ন ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে সাহায্য করবে।
মস্তিষ্কের কার্যকারিতা
প্যারাসুট নারিকেল তেলের উপকারিতা হিসেবে মেনশন করার মতো আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বৃদ্ধি। গবেষণা বলছে নারিকেল তেলে থাকা MCTs দ্রুত শোষিত হয়ে একধরণের শক্তিতে পরিণত হয়। ফলে বিশেষ করে অ্যালঝাইমার্স রোগীদের মস্তিষ্কের কার্যকারিতা অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এক্ষেত্রে কিন্তু আপনাকে নারিকেল তেল খেতে হবে। কেবল মালিশ কিংবা ব্যবহারেই কাজ হবে না।
ওজন হ্রাস
নারিকেল তেলে থাকা বিশেষ উপাদান MCTs আমাদের শরীরের বাড়তি ক্যালোরি পোড়াতে সাহায্য করে। আর আপনি তো জানেনই, বাড়তি ক্যালোরি পোড়ানো মানেই শরীরের ওজা অটোমেটিক কমে আসা। তাছাড়া যারা নারিকেল তেলে তৈরি খাবার খায় তাদের অল্প খাবারে সহজে পেট ভরে যায়। যার কারণে বাড়তি খাবারও খেতে হয় না, শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরিও গ্রহণ করতে হয় না।
হজমশক্তি
প্যারাসুট নারিকেল তেলের উপকারিতা হিসাবে হজমশক্তি বৃদ্ধির বিষয়টিও অন্যতম। আপনি কি জানেন আপনার শরীরের ধরণ অনুযায়ী আপনাকে প্রতিনিয়ত ফ্যাট-দ্রবণীয় ভিটামিন, খনিজ, এবং অ্যামিনো অ্যাসিড শোষণ করতে হয়? আর এই বিষয়টি অনেক সময় স্লো হয়ে শরীরের নাজুক অবস্থার কারণে। ফলে কমে আসে হজমশক্তি। যত অল্পই খান, দেখবেন খাবার কোনোমতেই হজম হতে চাইছে না। এমন পরিস্থিতিতে নারিকেল তেলে তৈরি খাবার খেতে পারেন। কারণ উল্লিখিত উপাদানগুলি দ্রুত শোষণ করতে নারিকেল তেল ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
প্রত্যেকটা উপাদানের কিন্তু আলাদা আলাদা গুণ থাকে। ঠিক তেমনই নারিকেল তেলের আছে লরিক অ্যাসিড অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল, অ্যান্টিভাইরাল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল গুণাবলি। এসব গুণাবলি নিয়ে যদি একটু রিসার্চ করেন দেখবেন প্রত্যেকটা গুণই মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। আর যারা নারিকেল তেলের উপকারিতা ও অপকারিতার ব্যাপারে সিরিয়াস তারা তো জানেনই না এই তেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকাটাই কত বিশাল ব্যাপার।
ময়েশ্চারাইজিং
এতোক্ষণ তো জানলেন নারিকেল তেল খেলে কি কি উপকার পেতে পারেন সে ব্যাপারে। এবার চলুন এই তেল ব্যবহারে কি কি উপকার পাওয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা করি। নারিকেল তেল কিন্তু বহু বছর ধরে প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে আসছে। যা ত্বককে শুষ্কতা এবং ফ্লাকিনেস থেকে রক্ষা করে থাকে। যাদের ড্রাই স্কিন তারা চাইলে নিয়মিত ১ বার করে স্কিনে নারিকেল তেল এপ্লাই করতে পারেন।
সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইা
মানবদেহের ভেতরকার অংশের পাশাপাশি অনেকসময় স্কিনেও সংক্রমণের রিস্ক থাকে। এক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারেন নারিকেল তেল। নারিকেল তেলে থাকা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল গুণাবলী ত্বকের সংক্রমণ, ক্ষত, এমনি পোড়া চিকিৎসায়ও বেশ কার্যকরী ভুমিকা রাখে। সো এই সুযোগ মিস করবেন না।
বয়সের ছাপ
ফ্রি র্যাডিক্যালের কারণে আমাদের ত্বকে সময়ের আগেই অনেক সময় ভাঁজ পড়ে যায়। প্যারাসুট নারিকেল তেলের উপকারিতা হিসাবে এই বিষয়টি কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ! রিসার্চ বলছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ এই নারিকেল তেল আমাদের স্কিনের ফ্রি র্যাডিক্যালের বিরুদ্ধে লড়াই করে থাকে। যার কারণে স্কিনে বয়সের ছাপ দ্রুত পড়ে না। যাদের কুঁচকে যাওয়া ত্বক আছে তারাও বেশ উপকৃত হয় এই নারিকেল তেলের ব্যবহারে।
জ্বালাপোড়া রোধ
চলছে নারিকেল তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে বিস্তর আলোচনা এবং আলোচনার এই অংশে জানাবো নারিকেল তেল কি আদৌ ত্বকের জ্বালাপোড়া সারাতে পারে কিনা! হ্যাঁ বস! পারে। নারিকেল তেলের সেই ক্যাপাসিটি আছে। নারিকেল তেলে রয়েছে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি গুণাবলী। যা একইসাথে স্কিনের একজিমা, সোরিয়াসিস, এবং ডার্মাটাইটিসের সমস্যা সারায়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো এসব সমস্যা সারাতে নারিকেল তেল মেডিসিনের চাইতেও দ্রুত কাজ করে।
লম্বা চুল
কোমর গড়ানো চুল কার না পছন্দ! অথচ চুলে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে করে চুলের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন অনেকে। আবার অনেকে তো চুলের সঠিক যত্ন করেও পাচ্ছেন না ভালো কোনো ফল! এমনটা কেনো হচ্ছে জানেন? কারণ আপনি চুলে নিয়ম করে নারিকেল তেল দিচ্ছেন না। জেনে অবাক হবেন অন্যান্য অনেক তেলের চেয়ে নারিকেল তেল চুলে অনেক ভালোভাবে প্রবেশ করে। যার কারণে এই তেল চুলের মজবুতি গড়ন নিশ্চিতে এবং বৃদ্ধিতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
খুশকির বিদায়
প্যারাসুট নারিকেল তেলের উপকারিতা হিসাবে খুশকির প্রবণতা কমার বিষয়টি বলা যায়। রিসার্চ করে জানা গেছে নারিকেল তেলে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিফাঙ্গাল গুণাবলী আছে। আর এই অ্যান্টিফাঙ্গাল গুণাবলী একইসাথে চুলের শুকনো স্কাল্পের চিকিৎসায় এবং খুশকি দূর করতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। সুতরাং যাদের মাথায় প্রচুর খুশকির সমস্যা তারা শ্যাম্পু করার আগে বা গোসলের আগে চুলে নারিকেল তেল ব্যবহার করতে পারেন।
চুলের ড্যামেজ রোধ
কথায় আছে মন ভাঙার চাইতে চুলের ড্যামেজ মেনে নেওয়া মেয়েদের জন্যে অনেক কষ্টকর। আর যারা বহু বছর ধরে এই কষ্ট ভোগ করে আসছেন তারা নিশ্চয় নিয়মিত নারিকেল তেলের ব্যবহার নিশ্চিত করছেন না। মনে রাখবেন নারিকেল তেল কিন্তু প্রাকৃতিক কন্ডিশনার হিসেবে কাজ করে। যাদের চুল ইতিমধ্যেই ড্যামেজ হয়ে গেছে তারা নারিকেল তেল ব্যবহার করে নিউ শাইনি চুল আশা করতে পারেন, তাও বেশ অল্প সময়ে।
তবে হ্যাঁ! মনে রাখবেন ব্যবহার করা নারিকেল তেল ১০০% বিশুদ্ধ না হলে এবং এতে রাসায়নিক পদার্থ মেশানো থাকলে তা আপনার লাভের পরিবর্তে ক্ষতি করে বসবে। সুতরাং সাবধান। মেয়ার ছাড়া যেকোনো ব্র্যান্ডের নারিকেল তেলকে না বলুন।
প্যারাসুট নারিকেল তেলের অপকারিতা
যেহেতু আমাদের আজকের এই লেখাটি নারিকেল তেলের উপকারিতা ও অপকারিতাসহ এই তেলের সকল দিক নিয়ে সাজানো হয়েছে সেহেতু নারিকেল তেলের অপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা না করাটা সবচেয়ে বড় বোকামি। তবে চলুন নারিকেল তেলের বেশকিছু অপকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করি:
১. যাদের নারিকেল তেলের উপর এলার্জির সমস্যা আছে তারা নারিকেল তেল ব্যবহারে ত্বকে চুলকানি, লালচে ভাব বা র্যাশজনিত সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যায় ভুগতে পারেন। সুতরাং এই বিষয়টা নিয়ে আগে থেকেই চিকিৎসকের সাথে কথা বলে নেবেন।
২. নারিকেল অতিরিক্ত ব্যবহার করার মতো তেল নয়। বিশেষ করে স্কিনে এবং চুলে এই তেল বেশি ব্যবহার করলে স্কিন এবং চুল পিছলে টাইপের হয়ে যেতে পারে। ভালো ফল পেতে নিয়মিত ২ বার করে ব্যবহার করতে পারেন।
৩. নারিকেল তেল কমেডোজেনিক বৈশিষ্ট্যের জন্যে বেশ পরিচিত। এই স্পেশাল বৈশিষ্ট্যের কারণে অতিমাত্রায় নারিকেল তেল ব্যবহার করলে স্কিনের ছিদ্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
নারিকেল তেল খাওয়ার নিয়ম
যারা এখনো আমাদের সাথে আছেন তারা নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন নারিকেল তেলের উপকারিতা ও অপকারিতার একেবারে শুরুতে আমরা নারিকেল তেল খেলে কি কি উপকার পাওয়া যায় সে-সম্পর্কে আলোচনা করেছি। সুতরাং লজিক্যালি নারিকেল তেল খাওয়া যায়। কিন্তু কিভাবে খেতে হয় তেল? খেতে গেলে কি বিশ্রী স্বাদের মুখে পড়তে হবে? জানতে হলে নিচের পয়েন্টগুলিতে ফোকাস করুন:
১. যাদের অভ্যাস নেই তারা শুরুতে ১ চামচ করে কাঁচা তেল খেতে পারেন। পরে ২ চামচে যাবেন।
২. স্মুদি, সালাদ, বা কফিতে অনায়াসে এই তেল মিক্স করে খেতে পারেন। যাদের কাঁচা তেল খাওয়ার অভ্যাস নেই তারা এভাবে ট্রাই করুন।
৩. আপনি যদি ডায়েটে থাকেন কিন্তু সেই আপনারই যদি বারবার খিদে লাগে সেক্ষেত্রে খাবার আগে ১ চামচ নারিকেল তেল খেতে পারেন। দেখবেন খিদে কমে গেছে।
৪. বিভিন্ন ফ্রাইড রেসিপিতে নারিকেল তেল ব্যবহার করা যায়। তবে তরকারিতে কিংবা সাধারণ রান্নায় এই তেল ব্যবহার করলে প্রথম প্রথম সেই স্বাদ পছন্দ নাও হতে পারে।
নারিকেল তেল খাওয়ার অপকারিতা
- ডায়েরিয়া হকে পারে
- হজমশক্তি কমে যায়
- পেটে ব্যাথা দেখা দেয়
- ওজন বেড়ে যায়
- কোলেস্টেরল বাড়িয়ে দেয়
- নারিকেল তেলের অ্যালার্জি হতে পারে
অর্গানিক নারিকেল তেল বোঝার উপায়
যতই নারিকেল তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে সচেতন হোন না কেনো কোনটা আসল তেল আর কোনটা নকল তেল তা যদি না বুঝতে পারেন দেখবেন সবশেষে গোল্লা। সুতরাং সময় থাকতে জেনে নিন অর্গানিক নারিকেল তেল বোঝার উপায়:
- প্যাকেটে অর্গানিক সার্টিফিকেশনের লেবেল চেক করুন
- রাসায়নিক, প্রিজারভেটিভ বা কৃত্রিম উপাদান আছে কিনা দেখুন
- স্বচ্ছ এবং এতে হালকা নারিকেলের গন্ধ না থাকলে সে তেল থেকে বিরত থাকুন
- গ্লাস বা ফুড-গ্রেড প্লাস্টিকের বোতল আছে এমন প্রোডাক্ট কিনুন
অর্গানির নারিকেল তৈরির উপায়
নারিকেল তেলের উপকারিতা ও অপকারিতাসহ বিস্তারিত তথ্য তো জানলেন! এবার চলুন না হয় জানা যাক ঘরে বসে কি করে বানিয়ে ফেলা যায় এই চমৎকার তেলটি। উপকরণ হিসেবে শুরুতে নিন:
- পাকা নারিকেল: ২-৩টি
- পানি: প্রয়োজন অনুযায়ী
এবার ভালোমতো নারিকেলগুলি কুড়িয়ে নিন। এরপর নারিকেলের দুধ বের করতে কুড়ে নেওয়া নারিকেল হালকা পানিসহ ব্লেন্ডারে দিন৷ ব্লেন্ড করা হয়ে গেলে এক টুকরো সুতি কাপড় বা ছাঁকনির সাহায্যে নারিকেল থেকে দুধ বের করে নিন। একটি প্যানে নারিকেলের দুধ ঢেলে মাঝারি আঁচে সিদ্ধ করুন। যখন দেখবেন দুধের উপরের দিকে তেল আলাদা হতে শুরু করেছে তখন জ্বাল কমিয়ে তেল আলাদা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন৷ ঠান্ডা হলে ছাঁকনির সাহায্যে তেল ছেঁকে নিন। সবশেষে এই তেল কোনো একটি পরিষ্কার প্লাস্টিকের বোতলে সংরক্ষণ করুন। ব্যাস! হয়ে গেলো আপনার হোমমেড নারিকেল তেল।