সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করে আয় করা সিক্রেট জানুন
“আমি তো শুধু ফেসবুকে ছবি পোস্ট করি আর সর্পদের সাথে চ্যাট, তাহলে কি আমি সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করতে পারব?”
এমন প্রশ্ন অনেকেরই মাথায় আসে। শুধুমাত্র ফান হিসাবে সোশ্যাল মিডিয়াকে নেওয়া, স্ক্রল করে স্ক্রল করে একের পর এক ভিডিও দেখার দিন প্রায় শেষ! বর্তমান যুগে সোশ্যাল মিডিয়া শুধু ফানের প্ল্যাটফর্ম নয়! বরং এই প্ল্যাটফর্ম আপনার পকেটও ভারি করার সক্ষমতা রাখে? কিন্তু কিভাবে?
জানতে হলে সাথেই থাকুন। জানুন সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করে আয় করার উপায়, কত টাকা আয় করা যায়, কি কি লাগে এবং কি কি ভুল করলে এই সেক্টরে ক্যারিয়ার শেষ।
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং কি?
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করে আয় করার শুরুতে পুরো কনসেপ্টের ব্যাপারে আপনার আইডিয়া থাকতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং (SMM) হলো এক ধরণের টেকনিক। যে টেকনিকের সাহায্যে আপনি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার, লিঙ্কডইন ইত্যাদির মাধ্যমে আপনার সার্ভিস এবং প্রোডাক্ট সেল করতে পারবেন।
ওভারঅল এই এই মার্কেটিংয়ের উদ্দেশ্য হলো আপনার ব্র্যান্ড বা প্রোডাক্টের ব্যাপারে এওয়্যারন্যাস তৈরি করা, সেলস বাড়ানো এবং অডিয়েন্সের সাথে একটি সম্পর্ক তৈরি করা। যা আপনাকে আপনার টার্গেট অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছাতে হেল্প করবে।
গবেষণা বলছে ২০২৩ সালে ৪.৭ বিলিয়ন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী ছিল বিশ্বব্যাপী। সহজ ভাষায় বললে, সোশ্যাল মিডিয়া হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অনলাইন গ্যাদার! আর আপনি তাদের মধ্যে নিজেকে ব্র্যান্ডিং করলে যে খুব একটা ফায়দা হবে না…তা ভাবলেন কি করে?
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করতে কি কি লাগে?
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করে আয় করাটা কঠিন কিছু নয়! যদি আপনি পারেন..সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করার মতো এবিলিটি তৈরি করতে! শুধু একটি ভালো ফোন বা ল্যাপটপ থাকলেই যে এই সেক্টরে সফল হবেন তা কিন্তু নয়। বরং এর পাশাপাশি দরকার স্কিল, প্ল্যানিং। বাই দ্যা ওয়ে…. এসব শুনে ভয় পাবেন না, আপনিও পারবেন ঠিক এভাবে:
১. স্ট্র্যাটেজি এবং প্ল্যানিং
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ে প্রো হতে হলে আপনাকে প্রথমে একটি পরিকল্পনা এবং স্ট্র্যাটেজি তৈরি করতে হবে। আপনি কি ধরনের কনটেন্ট তৈরি করবেন? কোন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে আপনার অডিয়েন্স আছে? কীভাবে আপনি আপনার প্রোডাক্ট বা সার্ভিসের মার্কেটিং করবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর আগে আপনাকে রেডি করতে হবে।
মনে রাখবেন সঠিক প্ল্যানিং ছাড়া পথ চলা অন্ধকারে অন্ধ হয়ে এগিয়ে যাওয়ার মতো।
২. ভালো কনটেন্ট তৈরি করা
মানতে কষ্ট হলেও মনে রাখবেন কনটেন্ট হলো সোশ্যাল মিডিয়ার প্রাণ। আপনি যদি আই ক্যাচি, ইউনিক এবং মানসম্পন্ন কনটেন্ট তৈরি না করেন, তবে আপনার অডিয়েন্স আপনাকে ফলো করবে না, কন্টেন্ট দেখবে না।
বলে রাখা ভালো এই কনটেন্টের মধ্যে কিন্তু গ্রাফিক্স, ভিডিও, ব্লগ পোস্ট, ইমেজ, ইনফোগ্রাফিক্স সবকিছুই পড়ে। আপনার কাজ হবে ফান, এনগেজিং কনটেন্ট তৈরি করে স্টোরি বা ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে অডিয়েন্সের সাথে আরও বেশি কানেক্টেড থাকা।
৩. সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নলেজ
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করতে হলে আপনাকে কিছু বেসিক নলেজ রাখতে হবে। কিছু জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মের সম্বন্ধে ভালো ধারণা রাখতে হবে।
সাপোস আপনি.. ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রাম এ ব্যবসা করতে চান! তাহলে আপনাকে অবশ্যই এসব প্ল্যাটফর্মের মার্কেটিং টুল এবং এড কিভাবে কাজ করে, সে সম্পর্কে আপনাকে জানতে হবে।
একইভাবে টুইটার, টিকটক, লিঙ্কডইন এসব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেও আপনার ভালো পারফরম্যান্স থাকতে হবে। অডিয়েন্স টার্গেট করে তাদের নিজের দখলে আনতে হবে কন্টেন্টের জোরে৷
৪. সময় এবং মনোযোগ
পিন পয়েন্ট এলার্ট! সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের জন্য সময় এবং মনোযোগ দিয়ে কাজ করে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে সোশ্যাল মিডিয়া একটি গ্রোয়িং এবং লেন্থি প্রসেস।
সো আপনাকে নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি এবং পোস্ট করতে হবে, কমিউনিটি ম্যানেজমেন্ট করতে হবে, এবং রেজাল্ট এনালাইস করে নতুন প্ল্যান সাজাতে হবে। সফল হতে চাইলে সময় দিতে হবে। এক রাতে ফেমাস হওয়া সম্ভব নয় এমন মেন্টালিটি নিয়ে আগাতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করে আয় করার উপায়
সব তো বুঝলাম! কিন্তু কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করে আমি আয় করবো? কিভাবে শুরু করবো? উত্তর নিচে:
১. ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে এড
ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে এড একটি এক্সপ্লোরেশন টুল বা সিস্টেম। এই সিস্টেমের মাধ্যমে আপনি আপনার প্রোডাক্ট বা সেবা সম্পর্কে বিভিন্ন এড তৈরি করতে পারেন। নির্দিষ্ট বয়স, লোকেশন, ইন্টারেস্ট সিলেক্ট করে যদি ভালো এড নিয়ে কাজ করা যায় তাহলে দেখবেন প্রচুর সেলস আসছে। এই ধরণের সার্ভিস দিয়ে যেমন আপনি নিজের বিজনেসে লাভ করতে পারবেন তেমনি অন্যদের সার্ভিস দিয়েও আর্ন করতে পারবেন।
২. অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং
সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রোডাক্ট প্রমোট করে আপনি অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি কোন প্রোডাক্ট বা সার্ভিসের প্রমোটার হয়ে তা সেলসের জন্য কমিশন পেতে পারেন। বলে রাখা ভালো অ্যামাজন অ্যাফিলিয়েট প্রোগ্রাম একটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম! যেখানে আপনি নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলের মাধ্যমে প্রোডাক্ট সেল করে মাসে ২০০/৩০০ ডলার আর্ন করতে পারবেন।
৩. কনটেন্ট ক্রিয়েশন
আপনি চাইলে সোশ্যাল মিডিয়াতে কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে কাজ করতে পারেন। ভিডিও তৈরি করে ইউটিউব বা ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা, ব্লগ লেখা, সিজনাল ক্যাম্পেইন তৈরি করা এসব হলো এই ধরণের মার্কেটিংয়ের কাজ। তাছাড়া ইউটিউবের মাধ্যমে আপনি AdSense থেকেও আয় করতে পারেন! যেখানে প্রতিটি ভিডিও ভিউ থেকে আর্ন করার সুযোগ থাকছে।
৪. সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট সার্ভিস
আপনি যদি সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞ হয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে ছোট বিজনেস বা ব্র্যান্ডগুলোকে সার্ভিস দিতে পারেন৷ যেখানে আপনাকে কনটেন্ট তৈরি, কাস্টমার ও ব্র্যান্ড মনিটরিং করতে হবে। বিনিময়ে আপনি মান্থলি বা উইকলি স্যালারি পাবেন।
৫. অনলাইন কোর্স এবং ওয়েবিনার
আপনি সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের উপর কোর্স তৈরি করে বা ওয়েবিনার দিয়েও আয় করতে পারেন৷ এভাবে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করে আয় করতে হলে আপনাকে বিভিন্ন ট্রেনিং সেশন আয়োজন করে মানুষের কাছে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং শেখাতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করে কত টাকা আয় করা যায়?
এবার আসি টাকার ব্যাপারে! যারা ভাবছেন, “সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করে কি অনেক টাকা আয় করা যায়?” তাদের বলবো! হ্যাঁ করা যায়! তবে এটা নির্ভর করবে আপনি কতটুকু সময় এবং শ্রম দেবেন তার উপর৷ কিভাবে আপনি মার্কেটিং করবেন এবং কিভাবে আপনার কনটেন্ট টার্গেট অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছাবেন তাও বলে দেবে আপনার আর্নিং ক্যাপাবিলিটি।
যেমন ধরুন: ফ্রিল্যান্স সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজারেরা প্রতি মাসে ইজিলি ৫০০-১০০০ ডলার আর্ন করতে পারে। অন্যদিকে ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবে ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে কাজ করলে আপনি প্রতিটি পোস্টের জন্য ১০০/২০০ ডলার বা তারও বেশি চার্জ করতে পারবেন। আর যদি আপনি ভালোভাবে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করতে পারেন তাহলে মিনিমাম ৫০০ ডলার তো পকেটে ঢুকবেই! তবে পুরো প্রসেসটাই প্রচুর সময় এবং এফোর্ট নেবে। এটলিস্ট ৬/৭ মাস কন্টিনিউয়াসলি কাজ করে যেতে হবে এবং প্রচুর শেখার মনমানসিকতা থাকতে হবে।
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ে যেসব ভুল করা যাবে না
যদি মনে করেন ব্যাস…সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করে আয় করার ব্যাপারে সবকিছু জেনে গেছি! এবার কোর্স শুরু করলেই টাকা আর টাকা! তবে বলবো ভুল ভাবছেন৷ কারণ এতো কিছু জানার পরও বাকি আছে আরো জানার! বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ে করা কমন মিসটেকগুলির ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। যেমন:
১. অনিয়মিত কনটেন্ট
সফল হতে চাইরে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত কনটেন্ট আপলোড করতে হবে। কনটেন্টের মানও মেইনটেইন করতে হবে। এক দিন আপনার কনটেন্ট খুবই প্রফেশনাল হলো অন্যদিকে সাদামাটা কিছু আপলোড করে দিলেন তা কিন্তু হবে না! কনটেন্টের ধরণ, ডিজাইন এবং ম্যাসেজ সবকিছু ঠিকঠাক এবং রিলেটেড থাকতে হবে।
২. অগোছালো এবং স্প্যামি পোস্টিং
“হ্যাঁ, এটাই ১০০% আপনার দরকার!” বা “এখনই কিনুন, অফার শেষ হওয়ার আগেই!” এই ধরণের ম্যাসেজ বা পোস্ট দিতেই পারেন৷ তবে এসব পোস্টের অতিরিক্ত পরিমাণে আপলোডিং আপনার অডিয়েন্সকে যথেষ্ট বিরক্তিতে ফেলবে। কোনো এক সময় দেখা যাবে আপনার ফলোয়াররা হয়তো আপনার পোস্টগুলো দেখা বন্ধ করে দিচ্ছে। সো এটা করা যাবে না!
৩. প্ল্যানিং ছাড়া পোস্ট
অনেকেই মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়াতে যেকোনো ভাবে কপি-পেস্ট করে পোস্ট করে দিলেই হলো! যা সবচেয়ে বড় মিস্টেক! পোস্ট করার আগে মাস্ট ক্যাম্পেইনের উদ্দেশ্য কী, পোস্ট করার সময় এবং পোস্টের ধরণের ব্যাপারে প্ল্যানিং করতে হবে৷ সবকিছু পরিকল্পনামাফিক সেট করে রেডি রাখতে হবে। যাতে সময়মতো পোস্ট আপলোড করা যায়।
৪. এক্সপেরিমেন্ট ছাড়া কিছু না করা
সোশ্যাল মিডিয়া টেকনিক কিছু এক্সপেরিমেন্ট করার জিনিস। সো প্রচুর এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে। কখনোই এক ধরনের পোস্ট বা টেকনিক নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। নতুন নতুন ট্রিকস কাজে লাগাতে হবে। পোস্টের ধরন, সময়, ট্যাগলাইন, পোস্টার সবকিছু নিয়েই এক্সপেরিমেন্ট করার অভ্যাস করতে হবে।
৫. কমিউনিটি ম্যানেজমেন্টে অবহেলা
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিংয়ের সবচেয়ে বড় ভুল হলো কমিউনিটি ম্যানেজমেন্টে অবহেলা। কেবলমাত্র পোস্ট করে একা একা বসে থাকলেই যে আপনার মার্কেটিং হয়ে যাবে, তা কিন্তু নয়। বরং বসে না থেকে ফলোয়ারদের প্রশ্নের উত্তর দিন, কমেন্টের রিপ্লাই করুন তাদের সাথে কমিউনিকেট করার চেষ্টা করুন৷ আপনার ব্র্যান্ডের প্রতি অডিয়েন্সের বিশ্বাস বাড়বে।
৬. ইনফ্লুয়েন্সার বা পার্টনার নির্বাচনে হেলা
যারা সোশ্যাল মিডিয়াতে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বা ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং করবেন ভাবছেন তাদের উচিত ভেবেচিন্তে সঠিক ইনফ্লুয়েন্সার বেছে নেওয়া। মনে রাখবেন আপনি যদি কোনো ভুল ইনফ্লুয়েন্সারের সঙ্গে কাজ করেন, তাহলে দেখবেন আপনার ব্র্যান্ড দিনকে দিন পপুলারিটি হারাচ্ছে। যা কখনোই কাম্য নয়।
ইতি কথা
আশা করি আপনার এই সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং করে আয়ের জার্নিতে আমার আজকের ছোট্ট এবং প্রাইমারি গাইডলাইন এতটুকু হলেও কাজে আসবে। মনে রাখবেন এই জার্নিতে প্রচুর লেগে থাকা দরকার। তবেই না আপনার আজকের লাইক বা শেয়ার আগামীকাল সেলস এবং ইন্টারেস্টে পরিণত হবে। হ্যাপি আর্নিং! ✌️
লেখা: সুলতানা আফিয়া তাসনিম