রোজা নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা: আপনিও কি এসব ভুলে বিশ্বাসী?
রমজান আসলেই আমাদের চারপাশে নানা ধরনের ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। কেউ বলে, রোজা রেখে ব্রাশ করলে রোজা ভেঙে যাবে, কেউ বলে, ভুলে কিছু খেলেও রোজা নষ্ট হয়ে যায়!
কিন্তু আসল সত্য কী? ইসলাম কি বলে? বিজ্ঞান কী বলে?
আসুন তবে এই আর্টিকেলে আমরা রোজা নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা সম্পর্কে আলোচনা করি। জানার চেষ্টা করি আসল সত্য।
১. রোজা থাকলে ব্রাশ করা হারাম - এর সত্যতা কতটুকু?
অনেকে মনে করেন, রোজা রেখে দাঁত ব্রাশ করলে বা মিসওয়াক করলে রোজা ভেঙে যায়।
কিন্তু ইসলামে স্পষ্টভাবে বলা আছে, মিসওয়াক করা সুন্নাহ এবং এতে রোজা ভাঙে না। এমনকি দাঁত ব্রাশ করাও জায়েজ, তবে সাবধান থাকতে হবে যেনো টুথপেস্ট বা পানি গিলে না ফেলা হয়। সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ১৯৩১!
তবে যারা রোজা রেখে ব্রাশ করেন তারা সতর্কতা হিসাবে ব্রাশ করার সময় কম টুথপেস্ট নিতে পারেন। তাছাড়া সকালে ফজরের আগে ব্রাশ করে নেওয়াটাও বুদ্ধিমানের কাজ!
২. ভুল করে কিছু খেলেই রোজা ভেঙে যায় – সত্য নাকি মিথ?
অনেকে মনে করেন, রোজা রেখে যদি ভুল করে পানি পান করা হয় বা কিছু খেয়ে ফেলা হয়, তাহলে রোজা বাতিল হয়ে যাবে।
তবে এ-ব্যাপারে মূল সত্য হলো, ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী, যদি কেউ ভুলবশত কিছু খেয়ে ফেলে, তাহলে রোজা নষ্ট হবে না। বরং মনে করতে হবে এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত। তবে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার গ্রহণ করেন, তাহলে রোজা অবশ্যই বাতিল হয়ে যাবে। সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ১১৫৫।
এই ভুল যদি করেও থাকেন সেক্ষেত্রে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে থামাবেন। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবেন। আশা করি তিনি ক্ষমা করে দেবেন।
৩. রোজা রেখে গোসল করা ঠিক না - এটা কি সত্য?
রোজা রেখে গোসল করলে রোজা নষ্ট হয়ে যেতে পারে এমন ধারণা কখনোই করা যাবে না। কারণ এই সময়টাতে গোসল করা একদম বৈধ। তাছাড়া রোজায় গোসল করার অভ্যাস শরীর ঠান্ডা রাখার জন্য যথেষ্ট উপকারী। তবে সাবধান থাকতে হবে যেন গোসল করার সময় পানি গিলে না ফেলা হয় বা কানের ভেতর পানি চলে না যায়। সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ১৯২৬।
এক্ষেত্রে এক্সপার্ট টিপস হিসাবে প্রচণ্ড গরমে তীব্র ক্লান্তি এড়াতে রোজা রেখে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করা যেতে পারে।
৪. রোজা রেখে ইনজেকশন নিলে রোজা ভেঙে যায় - সত্য নাকি গুজব?
ইনজেকশন মানেই শরীরে কিছু প্রবেশ করানো! তবে এতে আপনার রোজার কোনো সমস্যা হবে না। বিশেষ করে যদি আপনার ইনজেকশন পুষ্টি রিলেটেড না হয় যেমন গ্লুকোজ বা অন্য কোনো ভিটামিন না হয়, তাহলে তাতে আপনার রোজা নষ্ট হবে না। মোটকথা ইনসুলিন বা সাধারণ ব্যথার ইনজেকশন নিলে রোজার ক্ষতি হয় না। সূত্র: ফিকহুল ইবাদাত, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৬৩!
৫. রোজা রেখে ব্যায়াম করা যাবে না - বিজ্ঞান কী বলে?
অনেকে মনে করেন, রোজা রেখে ব্যায়াম করলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে বা আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন। যা পুরোপুরি ভুল ধারণা।
আপনি জেনে অবাক হবেন, কাতারের Aspetar Sports Medicine Journal নামের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সন্ধ্যায় মানে ইফতারের আগে হালকা ব্যায়াম করতে পারলে শরীরের মেটাবলিজম অনেক ভালো থাকে।
তবে হ্যাঁ! রোজা রাখলে সবসময় অতিরিক্ত পরিশ্রমজনিত ব্যায়াম এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবেন।
৬. ইফতার দেরি করে করলে বেশি সওয়াব – ইসলাম কী বলে?
যারা মনে করেন ইফতার একটু দেরি করে করলে বেশি সওয়াব পাওয়া যায় তাদের অনুরোধ করবো এই ভুল করে আপনার রোজাকে হালকা করে ফেলবেন না। মনে রাখবেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, সূর্য ডোবার পর দ্রুত ইফতার করা সুন্নাহ। ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করলে কোনো অতিরিক্ত সওয়াব পাওয়া যাবে না। সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ১৯৫৭!
৭. আজান শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইফতার করা যাবে না – এই নিয়ম কোথা থেকে এলো?
অনেকের মতে, আজান শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইফতার করলে রোজা ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু আসল সত্য হলো সৌদি আরব, মিশর এবং পাকিস্তানের ইসলামি স্কলারদের মতে, সূর্যাস্তের পরেই ইফতার করা উচিত। আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার কোনো দরকার নেই। সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ১০৯৮।
ইতি কথা
সবশেষে বলবো রোজার ব্যাপারে ভুল ধারণা নয়, সঠিক জ্ঞান অর্জন করুন! কারণ রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। তাই আমাদের উচিত রোজার সঠিক নিয়ম-কানুন জানা এবং প্রচলিত সব ভুল ধারণা থেকে নিজেকে দূরে রাখা। আল্লাহ পাক আমাদের সকলের এই প্রচেষ্টা এবং পরিবর্তন কবুল করুক, আমিন।
Author: Sultana Afia Tasnim